Savvy Sabrina
“আমি ভাবনায় গঠিত
প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি নীরবতাও
আমার মনে চিন্তার তরঙ্গ তোলে।”
07/07/2026
প্রতিটি মানুষের জীবনেই সুখ আছে, দুঃখ আছে। আছে হাসি, হাহাকার। কারও জীবন পূর্ণ, কারও জীবন অপূর্ণ।জীবন আমাদের হাতে থাকে না। কিন্তু জীবনকে কীভাবে বয়ে নিয়ে যাব, সেই সিদ্ধান্তটুকু হয়ত আমাদেরই।
আমি খুব সাধারণ কিছু বিষয়ও সাধারণভাবে নিতে পারি না। কেউ এটাকে অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা বলবেন, কেউ মানসিক দুর্বলতা। আমি জানি না কোনটি সত্য। শুধু জানি কিছু দৃশ্য আমার ভেতরে স্থায়ী হয়ে যায়। অনেক দিন, অনেক মাস, কখনও কখনও অনেক বছর পর্যন্ত। ঠিক এমনি একটা ঘটনা আজ লিখছি।
গত ঈদের ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিলাম। তার কয়েক মাস আগে আমার এক ফুফাতো বোন তার স্বামীকে হারিয়েছিলেন। ফোনে মৃত্যুসংবাদটি শুনে আমি যথারীতি বলেছিলাম, "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।" মন খারাপ হয়েছিল কিন্তু তখন বুঝিনি, শোকেরও কতরকমের স্তর আছে!
ঈদে বাড়ি গিয়ে একদিন আমরা সবাই তাকে দেখতে গেলাম।
বসে আছি। এমন সময় দশ -এগারো বছরের একটি মেয়ে এসে ঘরে ঢুকল। পরে জানলাম, সে আমার সেই ফুফাতো বোনের দ্বিতীয় সন্তান। ক্লাস ফোর বা ফাইভে পড়ে। কী অদ্ভুত যত্নে সে বারবার তার ওড়নাটা ঠিক করছিল। কি সারল্য তার চাহনিতে । সেই ছোট্ট বয়সেই কতটা লজ্জাবোধ, কতটা ভদ্রতা, কতটা নিষ্পাপ সৌন্দর্য!
আমি তাকে কাছে ডাকলাম। নাম জিজ্ঞেস করলাম, কোন ক্লাসে পড়ে জানতে চাইলাম। সে মিষ্টি করে হেসে উত্তর দিচ্ছে।আমি তাকে একবারও তার বাবার কথা জিজ্ঞেস করতে পারিনি। সাহস হয়নি। কারণ আমি নিজেই এখনও বাবা-মাকে ছাড়া পৃথিবী কল্পনা করতে পারি না। আর এই ছোট্ট মেয়েটি সেই বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিদিন ঘুমায়, প্রতিদিন জেগে ওঠে।
আমার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
তারপর এল আমার সেই ফুফাতো বোন।
আমি ভেবেছিলাম, সে হয়তো আমাদের দেখেই ভেঙে পড়বে। হয়তো কাঁদতে কাঁদতে বলবে, "আমি আর পারছি না।"কিন্তু না।
সে শান্তভাবে এসে আমার মায়ের পাশে বসলো। ঘরের এক কোনের দিকে অবিশ্বাস এর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বসে আছে।
আমি যতই তার দিকে তাকাচ্ছিলাম, ততই অবাক হচ্ছিলাম। কী অপূর্ব সুন্দর একজন নারী!
মনে হচ্ছিল শরৎচন্দ্রের বিষবৃক্ষ উপন্যাসের কুন্দনন্দিনী আমার সামনে এসে বসলো। তিন সন্তানের মা হয়েও তার মুখে ছিল এক অদ্ভুত কোমলতা।
বারবার মনে হচ্ছিল এখন কী হবে তাদের? একজন স্বামীহারা নারী হিসেবে নিজের শোক, সমাজের বাস্তবতা আর তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ সবকিছু একা কীভাবে সামলাবেন তিনি?
একফোঁটা কান্না নেই।কোনো উচ্চস্বরে বিলাপ নেই।
শুধু গভীর, নিস্তব্ধ এক নীরবতা।
সেই নীরবতা আমার সহ্য হচ্ছিল না।
আমি বারবার নিজেকে তার জায়গায় দাঁড় করাচ্ছিলাম। যে মানুষটির সঙ্গে সে সংসার গড়েছিল, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিয়েছিল, যার সঙ্গে বার্ধক্য পর্যন্ত একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল সে মানুষটি আজ নেই।
এ শূন্যতা কি সত্যিই মেনে নেওয়া যায়?
হঠাৎ সে আমার মায়ের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
"মামানি, বাইরে যতই কোথাও যাক, যদি কোনো কিছু ভালো লাগত, পলিথিনে করে হলেও আমার জন্য নিয়ে আসত। একটা বিস্কুটও একা খেত না। বাসায় নিয়ে এসে বলত, 'তুমি খাও।' সে এখন কোথায় গেল, মামানি? আমি তো ভেবেছিলাম, আমরা একসঙ্গে বুড়ো হব। আমি তার সেবা করব। তারপর একদিন হয়তো একজনের পর আরেকজন চলে যাব। কিন্তু সে তো এত তাড়াতাড়ি চলে গেল..."
তার প্রতিটি শব্দ আমার ভেতরটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল।আমার মা কাঁদছিলেন। সেও কথা গুলো বলতে বলতে চোখ দিয়ে অঝরে পানি ফেলছে। কিন্তু হাহাকার করে তার কষ্ট সে দেখাতে পারছেন না
তখন মনে হচ্ছিল, মানুষের এমনও কান্না আছে, যা চোখ দিয়ে বের হয় না। যা বুকের ভেতর জমে পাথর হয়ে যায়। যে কান্নার কোনো শব্দ নেই, শুধু আছে নিঃশব্দ ভাঙচুর।
আমি আর সেখানে বসে থাকতে পারছিলাম । ফুফু ফুফা সবার সামনে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলাম সে কান্না আর থামেনা, বুক ভার হয়ে ব্যাথা করতে শুরু হলো। সবাই বেশ অবাক হচ্ছে বুঝেছিলাম।কারন সেই বোনের সাথে আমার কখনো তেমন কথা, দেখা বা কোন রকম সখ্যতা ও নেই। সুতরাং তার এই কষ্টে নিজেকে এতটা জড়িয়ে ফেলার কারন নেই। কিন্তু আমি যে এমনি তা বুঝানোর চেষ্টা সেদিন করি নি।
হাসফাস করে বের হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু একটাই দোয়া করছিলাম
হে আল্লাহ, মানুষকে এমন শোক দিও না, যে শোক মানুষকে কাঁদার শক্তিটুকুও কেড়ে নেয়।
সেদিন আমি বুঝেছিলাম, পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী কান্না সেই কান্না, যা চোখে আসে না। যে কান্না নিঃশব্দে মানুষের হৃদয়কে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে দেয়।
_সাবরিনা🍀
Website
Address
Sylhet
Alerts
Be the first to know and let us send you an email when Savvy Sabrina posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.